মুর্শিদাবাদ জেলার
পূর্বপ্রান্তে পদ্মার নদীর সংলগ্ন লালগোলা। এই এলাকা একসময় ঘন জঙ্গলে আবৃত ছিল। অষ্টাদশ
শতকের প্রথমদিকে উত্তরপ্রদেশের গাজীপুর জেলার পার্সী গ্রাম থেকে লালগোলা রাজবংশের প্রথম
পুরুষ মহিমাচরণ রায় ভাগ্যের খোঁজে পদ্মার পূর্বতীর সংলগ্ন রাজশাহী জেলার সুন্দরপুর
গ্রামে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু পদ্মার গ্রাসে সুন্দরপুর গ্রাম ধ্বংস হলে তাঁর পুত্রদ্বয়
দলেল রায় ও রাজনাথ রায় অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কলকলি নদী সংলগ্ন গভীর বনের কিছু
অংশ পরিস্কার করে বসতি স্থাপন করেন। স্থানটির নাম হয় শ্রীমন্তপুর।
দলেল রায় ১৭৪০
সালে নবাব পরিবারের জিলাদারী কাজ ও ১৭৪৭-৪৮ সালে রানী ভবানী এস্টেটের সৈন্যদলের সেনাপতির
কাজ করেন। বেশ কিছু সম্পত্তি কিনে এখানে তিনি নীল, রেশম ও ধানের আড়ৎ-এর ব্যবসা করেন।
ঐগুলিই ছিল দলেল রায়ের গোলা। ভাষার অপভ্রংশে লাল রায়ের গোলা নামে পরিচিতি ছিল। পরবর্তিতে
এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় লালগোলা।
দলেল রায়ের মৃত্যুর
পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র নীলকন্ঠ রায় লালগোলার জমিদার হন। তিনি নবাব দরবার থেকে 'রাও'
উপাধি লাভ করেন। নীলকন্ঠ রায়ের পুত্র রাও আত্মনারায়ণ রায়ের পর লালগোলার জমিদার হন তাঁর
(আত্মনারায়ণ) পুত্র রাও রাম শঙ্কর রায়। রাজা রাও রামশঙ্কর রায়-ই ছিলেন বর্তমান লালগোলার
রূপকার। তাঁর আমলেই আনুমানিক ১৮০০ সালে লালগোলার নতুন রাজবাড়ি তৈরি, ১৮১৩ সালে রঘুনাথ
মন্দির এবং কালীমন্দির সংস্কার ও নির্মাণ, ১৮৩৬ সালে লালগোলার বাজার 'সুদর্শনগঞ্জ'
স্থাপন, ১৮২৩ সালে রথযাত্রার প্রচলন হয়।
রাজা রামশঙ্কর
রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাও মহেশনারায়ণ রায় লালগোলার রাজা হন। তিনি লালগোলা ও
ভগবানগোলার বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশ থেকে রাম
চরিত রায়কে দত্তক রূপে গ্রহণ করেন। ইনিই লালগোলার রাজা দানবীর রাজা যোগেন্দ্র নারায়ণ
রাও। মহারাজ যোগেন্দ্র নারায়ণ রাও শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, দরিদ্র সেবা,
ধর্ম ও মন্দির নির্মাণ ইত্যাদি কাজে বহু কিছু দান করেন। তাঁর এই সব পুণ্য কাজের জন্য
মহারাজা, নাইট, স্যার, সি.আই-ই উপাধি লাভ করেন। ১৩৫৩ সালের ১লা ভাদ্র তিনি পরলোক গমন
করেন।
যোগেন্দ্র নারায়ণের
পুত্র হেমেন্দ্র নারায়ণের পুত্র কুমার বাহাদুর ধীরেন্দ্র নারায়ণ রায় ছিলেন লালগোলার
শেষ রাজা। তাঁর আমলেও লালগোলার বহু কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়।
বর্তমানে রাজবাড়ি
সংস্কার করে মিউজিয়াম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে পুরাতত্ত্ব বিভাগ।

No comments:
Post a Comment